আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ৪ মার্চ:
কঠোর ইসলামি শাসনতন্ত্র ও শরিয়া আইনের দেশ ইরানে মাদকদ্রব্যের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বা বেত্রাঘাতের বিধান থাকলেও, দেশটিতে নীরবে এক ভিন্ন চিত্র তৈরি হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানে গাঁজা বা স্থানীয় ভাষায় পরিচিত 'গোল' (Gol)-এর ব্যবহার ও চাষ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে তরুণ সমাজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই মাদকের জনপ্রিয়তা এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
'গোল' বা গাঁজার নীরব বিস্তার
ইরানে গাঁজাকে সাধারণত 'গোল' বা 'ফুল' বলা হয়। আফিম বা হেরোইনের মতো মাদকের বিরুদ্ধে ইরান সরকার কঠোর জিরো-টলারেন্স নীতি গ্রহণ করলেও, গাঁজার ক্ষেত্রে প্রশাসনের এক ধরনের নীরবতা বা শিথিলতা লক্ষ্য করা গেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন এবং সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, তেহরানের পার্ক, ক্যাফে, এমনকি স্কি রিসোর্টগুলোতেও খুব সহজেই এই 'গোল' পাওয়া যাচ্ছে।
পরিসংখ্যান কী বলছে?
তরুণদের মধ্যে আসক্তি: PLoS One জার্নালে প্রকাশিত জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইরানের গবেষকদের একটি যৌথ ‘সিস্টেমেটিক রিভিউ’ অনুযায়ী, গত দুই দশকে ইরানে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে গাঁজা ব্যবহারের হার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
ব্যবহারকারীর ধরন: আগে ইরানে মূলত বয়স্ক বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে আফিমের প্রচলন বেশি থাকলেও, বর্তমানে গাঁজার ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ উচ্চ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত তরুণ-তরুণী।
পুনর্বাসন কেন্দ্রের চিত্র: তেহরানের বিভিন্ন মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রের পরিচালকরা জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরে শুধু গাঁজায় আসক্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
চাষ ও ব্যবহার বৃদ্ধির পেছনের কারণ
বিশেষজ্ঞরা ইরানে গাঁজার এই নীরব বিস্তারের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন:
১. অর্থনৈতিক হতাশা ও বেকারত্ব: ইরানে বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার অত্যন্ত বেশি। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা তরুণদের মাদকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
২. আইনের অস্পষ্টতা: ইরানের কঠোর দণ্ডবিধিতে অন্যান্য মাদকের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও গাঁজার বিষয়ে আইনের প্রয়োগ কিছুটা অস্পষ্ট, যার সুযোগ নিচ্ছে মাদক কারবারিরা।
৩. ভুল ধারণা: তরুণদের মাঝে একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে যে, 'গোল' বা গাঁজা অন্যান্য রাসায়নিক মাদকের মতো ক্ষতিকর বা দীর্ঘস্থায়ী আসক্তি সৃষ্টিকারী নয়।
উদ্বিগ্ন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের (UNODC) রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী গাঁজা ও অন্যান্য মাদকের উৎপাদন বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে ইরানেও। দেশটিতে গাঁজার অভ্যন্তরীণ চাষাবাদও আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, এখনই এই 'গেটওয়ে ড্রাগ' (Gateway drug)-এর লাগাম টেনে না ধরলে সমাজ এক ভয়াবহ মানসিক ও স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
তথ্যসূত্র:
PLoS One জার্নাল: "Evidence for an increase in cannabis use in Iran – A systematic review and trend analysis" শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন।
দ্য জেরুজালেম পোস্ট ও নিউইয়র্ক টাইমস: ইরানে 'গোল' বা গাঁজার সহজলভ্যতা ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ।
UNODC (জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর): বৈশ্বিক মাদক পরিস্থিতি এবং ইরানে মাদকের বিস্তার বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদন।